বিশ্বজুড়ে অতিধনী পরিবারগুলোয় বিনিয়োগের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর আগে তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নতুন স্টার্টআপ, এখন খেলাধুলার দুনিয়ায় আর্থিক ভবিষ্যৎ দেখছেন তারা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক জরিপের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে অন্তত ২৫ শতাংশ ফ্যামিলি অফিস এরই মধ্যে খেলাধুলা বা এ সম্পর্কিত খাতে বিনিয়োগ করেছে। শিগগিরই এ খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে আসছে আরো ২৫ শতাংশ পরিবার। খবর সিএনবিসি।
অবসর-বিনোদন খাতের চাহিদা কভিড-পূর্ব সময়ের তুলনায় দিন দিন বাড়ছে, যা ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগের বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করছে। টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে খেলার মাঠ বা স্টেডিয়াম নির্মাণের মতো ব্যবসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এতে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (এনএফএল) নিউইয়র্ক জায়ান্টসের শেয়ার কিনতে সম্মত হয়েছেন প্রয়াত বিলিয়নেয়ার ডেভিড কচের স্ত্রী জুলিয়া কচ ও তার পরিবার। অন্যদিকে গুগেনহাইম পার্টনারসের প্রধান নির্বাহী মার্ক ওয়াল্টার গত জুনে ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন (এনবিএ) লস অ্যাঞ্জেলেস লেকারসের ১ হাজার কোটি ডলার মূল্যের শেয়ার কিনেছে। মে মাসে বিনোদ খোসলাসহ কয়েকটি অতিধনী পরিবার যৌথভাবে সান ফ্রান্সিসকো ফোরটি নাইন্টিয়ার্সের ৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের জরিপে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনো মূলত পুরুষদের বড় লিগ ঘিরেই। ২৪৫টি ফ্যামিলি অফিসের মধ্যে ৭১ শতাংশ জানিয়েছে, তারা পুরুষদের শীর্ষ লিগে বিনিয়োগে আগ্রহী। নারীদের প্রতিষ্ঠিত লিগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মাত্র ১৯ শতাংশ ফ্যামিলি অফিস। নারীদের নতুন লিগ বা পুরুষদের নিচুস্তরের লিগে বিনিয়োগ বা আগ্রহী পরিবারের হার ১৬ শতাংশ। অবশ্য সম্প্রতি কয়েকজন ধনকুবের তিনটি নতুন ডব্লিউএনবিএ দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বিনিয়োগ থেকে দ্রুত নগদ মুনাফা আসার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারমূল্যের প্রবৃদ্ধিই বিনিয়োগকারীদের মূল লক্ষ্য।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গ্লোবাল প্রাইভেট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সহপ্রধান মিনা ফ্লিন বলেন, ‘ফ্যামিলি অফিসগুলো দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করে। ফলে তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা পছন্দের খাতে যুক্ত থাকতে পারেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ পান।’
অনেক বিনিয়োগকারী ক্রীড়া খাতকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে দেখেন। কারণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টিকিট, সম্প্রচারস্বত্ব ও স্ট্রিমিং থেকে আসা আয়। খেলার বাজারের তুলনামূলক স্থিতিশীল এ অবস্থা দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
শুধু দল কিনেই থেমে থাকছেন না ধনকুবেররা। খেলার বাইরের বিভিন্ন খাতেও তারা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। এর উদাহরণ ব্ল্যাকস্টোনের ডেভিড ব্লিৎজার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি শীর্ষ পুরুষ লিগ এনএফএল, এনবিএ, এমএলবি, এনএইচএল ও এমএলএস—সবক’টিতেই শেয়ার কিনে রাখা প্রথম ব্যক্তি।
পরিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বোল্ট ভেঞ্চারস চলতি বছর নানা ধরনের খেলাধুলাসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে আছে ফ্যান্টাসি লাইফ নামের এক খেলাধুলাবিষয়ক মিডিয়া কোম্পানি, বলার্স নামের র্যাকেট স্পোর্টস ক্লাব চেইন ও ক্লাব পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান প্যাডেল হাউজ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধনকুবের পরিবারগুলোর কাছে খেলাধুলা এখন আর শুধু বিনোদন বা শখের বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান খাতে। খেলার দল মালিকানা থেকে শুরু করে স্টেডিয়াম, টিকিট ব্যবসা, সম্প্রচার অধিকার, এমনকি ক্লাব ও সামাজিক আড্ডাকেন্দ্র পর্যন্ত নানা জায়গায় তারা অর্থ লগ্নি করছেন। এসব বিনিয়োগ থেকে তাৎক্ষণিক আয় সীমিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য বাড়ার সুযোগ অনেক বেশি। এ কারণেই খেলাধুলা এখন তাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।